দিনটি ছিল শনিবার। প্রাইমারী স্কুল শিক্ষক আমরা প্রাইমারী স্কুলেই ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিলাম। ৩০ সদস্যের একটি শিক্ষকদল ঠিক সাড়ে নয়টার আগেই উপজেলা শিক্ষা অফিসের সামনে জড়ো হলাম। উদ্দেশ্য ২০০৯ সালের পঞ্চম শ্রেণির সমাপণী পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকারকারী প্রাথমিক বিদ্যলয়ের কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে তা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান আমাদের নিজ নিজ বিদ্যালয়ে প্রয়োগের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের সার্বিক মান উন্নয়ন। গাজীপুরের কালিগঞ্জ উপজেলা থেকে নরসিংদী জেলার মনোহরদী মডেল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। এক কথায় শিক্ষার জন্য শিক্ষা সফর। মাইক্রো ভাড়া করলাম চারটি কালো রঙয়ের। একটির সামনে আমাদের ভ্রমনের ব্যানার লাগিয়ে দিলাম। ভ্রমণ শুরু করলাম আল্লাহর উপর ভরসা করে। চলতে চলতেই মনোহরদি থানার ইউএনও, প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে আমাদের আগমন বার্তা জানিয়ে দিলাম।
ছবিতে বাম পাশ দিয়ে শীতলক্ষ্যা নদী। আমরা চলছি সড়ক পথে। কোন বাহনে চড়া মানেই আমাকে সামনে কোনো একটি আসনে বসতে হবে। একটা মাইক্রো'র চালকের সাথে বাম পাশের সীটে বসলাম। ভ্রমণ শুরু হল। শীতলক্ষ্যা নদীর পাড় ঘেঁষে চলছি।
দশ মিনিটের মধ্যেই আমরা ঘোরাশাল ব্রীজের উপর দিয়ে চললাম।
এই ছবিটা ঘোড়াশাল সড়ক পথের। রেল পথ ১০০ ফুট উত্তর দিয়ে প্রায় সমান্তরালভাবে পূর্ব দিকে এগিয়ে গেছে। ঘোড়াশাল ব্রীজের উপর দিয়ে যেভাবে পাড় হলাম; ভিডিওতে দেখুন।
[youtube|http://www.youtube.com/watch?v=yGLw9lYL1i8&feature=player_embedded]
নদীর পশ্চিম পাশেই সেভেন রিংস সিমেন্ট কারখানা।
আর পূর্ব পাশে রেল স্ট্যাশন। দুই ব্রীজের নিচ দিয়ে একটু উত্তরে অগ্রসর হলেই চোখে পড়বে প্রাণ ফ্যাক্টোরী নদীর তীর ঘেঁষে বিশাল জায়গার উপর দন্ডায়মান। আর একটু এগুলে দেখা যাবে ঘোড়াশালের বিখ্যাত সার কারখানা।
আমরা আপন মনে চলছি। আনুমানিক দেড় থেকে দুইশত গ্রামের বাঁকা পথের উপর দিয়ে চলছি। কখনো রৌদ্র কখনো বাহারী গাছের ছাঁয়া। তবে বাতাসটা বেশ চমৎকার লাগছে। আমার পাশের জানালা খোলা। সকাল থেকেই সূর্যটা কেমন যেন ক্ষিপ্ত হয়ে আছে। বাতাসের আমেজে সূর্যের প্রখরতা অনুভব করছি না। আমরা দুপুর ১টায় মনোহরদী মডেল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে এসে দাঁড়ালাম। চারপাশ দিয়ে ইটের দেয়াল বেষ্টিত। প্রথমেই বিদ্যালয়ের ন্যামপ্লেট চোখে পড়ল। আর দেখছি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রচন্ড রৌদ্রের ভেতর সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। ক্ষাণিকটা উৎফুল্ল হলাম আবার মনে খারাপও লাগল। তাপের প্রচন্ডতায় শিক্ষা অফিসার, ইউএনও, ইউআরসি ইনস্ট্রাক্টর, বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি সদস্যসহ অন্যান্য অতিথীবৃন্দ ঘামে ভিজে যাচ্ছেন। তারপরও অতিথীদের সংবর্ধনা বলে কথা। আমাদের স্বাগতম জানানোর জন্য গেইট থেকে বিদ্যালয়ের বারান্দা পর্যন্ত এক ঝাঁক শিক্ষার্থী রজনীগন্ধা আর গোলাপের তোড়া নিয়ে আমাদের হাতে হাতে দিয়ে স্বাগত জানাচ্ছে। এ যেন এক অন্য রকম দৃশ্য! বেশ অবাকই হলাম। আমরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের সাথে হ্যান্ড মাইকের সাহায্যে কুশল বিনিময় করলাম। শিক্ষক নেত্রীবৃন্দ সংক্ষিপ্ত কথা বললেন। শিক্ষার্থীরা জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন শেষে পিটি-প্যারেট করল। কষ্ট হলেও তাদের কাজগুলো আমাদের বেশ অনুপ্রাণিত করেছে। এখান থেকে আমরা প্রধান শিক্ষকের কক্ষে এসে বসলাম।
ঠান্ডা শরবত আর নাস্তা খেলা্ম। আসলে খুব পিপাসা লাগছিল। এই সময়ে এমন ঠান্ডা খাবার খুব যথার্থই হল। শিক্ষকবৃন্দের সাথে পরিচিত হলাম। প্রধান শিক্ষকের সাথে বসে ২৫ মিনিট বিদ্যালয়ের রেজাল্ট ভাল করার বিষয়ে মত বিনিময় করলাম। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, শিক্ষদের ক্লাস নেয়ার কৌশল, সবার মাঝের টীম স্প্রিট, শিক্ষক এবং কমিটির আন্তরিকতা ইত্যাদি আমাদের বেশ মুগ্ধ করেছে।
ছবিতে সাদিয়া শিকদার এবং শিক্ষকবৃন্দ। সাদিয়া শিকদার ২০০৯ সালে সারা বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম হয়েছে। সাদিয়া শিকদারকে আমাদের সামনে আনা হলো।
ছবিতে সাদিয়া শিকদার ও কৃতী শিক্ষার্থীদ্বয়।
মত বিনিময় শেষে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দ্বারা ৩০ মিনিটের একটি সাংস্কৃতিক অনূষ্ঠান উপস্থাপন করা হল। সাদিয়াও সেখানে একটা গান গেয়ে শোনাল। কন্ঠ যদিও আল্লাহর দান তথাপিও চেষ্টায় অনেক কিছু সাধন করা সম্ভব। যারা পারে তারা প্রায় সবই কিছু না কিছু পারে। সাদিয়ার গান শুনে তাই প্রমাণিত হল। প্রাণটা জুড়িয়েই গেল। আমার মাঝে প্রবল উৎসাহ উদ্বীপনা কাজ করছে। তাই আমিও চাকমাদের ভাষায় একটি দেশের গান গেয়ে তাদের সাথে মিশে গেলাম। অনুষ্ঠানটা সবাই খুব উপভোগ করলাম।
তারপর মনোহরদী বাজারের একটি হোটেলে এক সাথে বসে দুপুরে খাবার খেয়ে চললাম ওয়ারী বটেশ্বরের দিকে। এখানে কয়েক বছর আগে প্রত্নতত্ত্বের সন্ধান মিলেছিল। বেশি সময় লাগলো না এখানে আসতে।
অনেকগুলো ছবি ঝুলছে। মিনি বোর্ডের আকারে ছবির ব্যাপারে লিখা রয়েছে। হেটে হেটে লেখাগুলো পড়লাম। আস্তে করে ৩ জন মুরুব্বী সামনে এল। সালাম এবং পরিচিতির পর আমাদেরকে এখানের বিভিন্ন অংশ ঘূরে ঘূরে দেখালেন। এদের একজন প্রাইমারি স্কুল থেকে মাত্র কিছুদিন হল এলপিআর ভোগ করছেন। বেশ ভাল লাগলো উনাকে পেয়ে। এবার আমাদের বেলুন ফুটানোর প্রতিযোগিতার পালা। সকলকে একটি করে বেলুন হাতে দিলাম। ৩জন আগন্তুককেও ৩টা বেলুন হাতে দিলাম।
প্রথমে নিয়ম বলে দিলাম। ছবির মত করে সব বেলুন ফোলিয়ে সুঁতা দিয়ে বেঁধে হাতে রাখতে হবে। আর নিজেরটা বাঁচিয়ে রেখে অপরের বেলুনটা কৌশলে ফুটাতে হবে। শুরু হল এক অন্য রকম আমেজ।
একটা করে বেলুন ফুটছে আর হৈ চৈ পড়ে যাচ্ছে। উত্তেজনা যেন চরম পর্যায়ে পৌঁছলো। অবেশেষে মামুন স্যার হলেন ৩য়, আমি ২য়। আর কালিগঞ্জ উপজেলা সহকারী ইন্সট্রাক্টর খাইরুদ্দিন স্যার হলেন প্রথম।
খুব মজা করেছি বেলুন ফুটিয়ে। খেলা শেষ হতেই মাগরিবের আযান শুনতে পেলাম। অযু করে মাগরিবের নামাজ জামায়াতের সাথে আদায় করে বাড়ির দিকে চললাম।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন