১১ জুলাই চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে যে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে, তাতে মারা যাওয়া ৪৪ জনের মধ্যে ৪০ জনই ছিল স্কুলের শিশু-কিশোর শিক্ষার্থী। আমরা এটা মেনে নিতে পারছি না। কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।
এর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে এ মাসেই। সিরাজগঞ্জের চৌহালীতে খেলে ফেরার পথে নৌকাডুবির ঘটনায় ৩ ছাত্রছাত্রীসহ চারজন নিখোঁজ হয়েছে। এসব ঘটনার জন্য দায়ী কে বা কারা? রাষ্ট্রযন্ত্র, সন্ত্রাস, বাসচালক, অর্থনৈতিক অবস্থা, সড়ক বিভাগ, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়—যে-ই হোক, ওটা যাদের বোঝা দরকার তারা বুঝুন গিয়ে। আমার ওসব বুঝে কী কাজ। আমি মেনে নিতে পারছি না। আমার ক্লাসে আমি যে বাচ্চাদের পড়াই, আমার বার বার মনে হচ্ছে তারা সবাই মরে গেছে। তাদের সবাইকে মেরে ফেলা হয়েছে। আমি আর কিছুই বুঝতে পারছি না।
আমি একটা সরকারি প্রাইমারি স্কুলে পড়াই। সহকারী শিক্ষক, তাই খুচরা দায়-দায়িত্ব বেশি নিতে হয়। সেই হিসেবে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে আমার বিদ্যালয়ের শিশুদের অনুশীলন-খেলতে নিয়ে যাওয়া এসব দায়িত্ব আমি পালন করছি। বাচ্চাদের সঙ্গের সময়টা আমার ভীষণ ভালো লাগে। কিন্তু আমি টের পাই, শিশুরা অনুশীলন করছে, খেলছে কিন্তু খুব আনন্দ পাচ্ছে না। পাচ্ছে না যে, তার কারণ এরা প্রাইমারি স্কুলে পড়ে। শহরের প্রাইমারি স্কুলে পড়ে যেখানে সমাজের একেবারে নিচুতলার লোকজন প্রাইমারি স্কুলে পড়ে। সবখানেই, সরকারি-বেসরকারি প্রাইমারি স্কুলের ফ্রি শিক্ষা আসলে গরিব মানুষদের জন্য। আমার স্কুলের ছেলেমেয়েরা অনেকেই তিনবেলা প্রয়োজনীয় খাবার পায় না। ওরা শক্তি খরচ করে খেলবে কী করে! কিন্তু তবুও ওরা অনিচ্ছা নিয়ে হলেও অনুশীলন করে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, আমরা কি এই বাচ্চা ছেলেমেয়েকে দিয়ে জোর করে আনন্দ করিয়ে নিচ্ছি? বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানানোও এই ফুটবল টুর্নামেন্টের একটা উদ্দেশ্য। আচ্ছা, আমরা কি বুঝতে পারি না, ইতিহাসের শিক্ষা অর্জন করা সম্ভব না যথেষ্ট পরিমাণে শারীরিক-মানসিক স্বস্তি না থাকলে। এই গরিব বাচ্চাদের কী আছে। এদের ওপর খেলা জুলুম হয়ে চেপে বসেছে বলেও মনে হয় তাই মাঝে মাঝে।
ভাবতে থাকি, ফুটবল খেলতে শিশুদের বিশেষ করে ৯-১০ বছর বয়সী শিশুদের যে শক্তি ক্ষয় হয় তা কী দিয়ে পূরণ হবে। এদের দিয়ে খেলানো হচ্ছে, অথচ এদের খাবার নেই। এদের শক্তি খরচ করানো হচ্ছে অথচ তা পূরণ করে দেয়া হচ্ছে না। এই খেলা জুলুম নয়তো কী!?
বাচ্চাদের ক্ষুধার্ত মুখ সহ্য করতে পারি না। কান্না পায় খালি। আমিও তো সরকারের তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী। প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার। আমার সামর্থ্যও তো তৃতীয় স্তরের। প্রধান শিক্ষককে বললাম একথা, তিনি জানালেন, এই ফুটবল খেলার জন্য স্কুলগুলোকে শিশুদের খাওয়া, নাস্তা কিংবা যাতায়াতে জন্য কোনো অর্থ সরকার থেকে সাহায্য দেয়া হয় না। উপজেলা শিক্ষা অফিসে মাত্র ৮ হাজার টাকা এসেছে গোটা উপজেলার ১১৮টি বিদ্যালয়ের জন্য। আমি শুনে ও দেখে অবাক হয়ে যাই। খানিক নিজের সামর্থ্যে আর খানিকটা প্রধান শিক্ষকের ব্যক্তিগত সামর্থ্যে শিশুদের জন্য কিছু চকলেট ছাড়া আর কিছুই ব্যবস্থা করতে পারি না আমরা। তাতে আবার আমাদের কম পড়ে যায়।
মিরসরাইয়ের মৃত শিশুদের কথা খবরের কাগজে পড়তে গিয়ে তাই আমার কাছে মনে হয়, যেন আমার সঙ্গে খেলতে যাওয়া আর খেলা দেখতে যাওয়া শিশুদেরই মৃত্যুসংবাদ পড়ছি। আমিও তো আমার শিশুদের এভাবেই খেলতে নিয়ে যাই। স্কুটারে গাদাগাদি করে পঁচিশ-ত্রিশজন নিয়ে যাই। ওইটুকু টাকার বেশি খরচ করা যে আমাদের মতো গরিব প্রাইমারি স্কুলের মাস্টারদের পক্ষে সম্ভব নয়। আর সেই শিশুদের বাবা-মায়ের পক্ষে তো আরও নয়। ওরাও তো মরে যেতে পারত? আর এরা আর ওরা কিসে। সবাই তো আমার সন্তান। ওদের বর্ণমালা শেখাই! ওদের হাতেখড়ি দিই। ওদের হাসিমুখ, মন খারাপের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসবাস করি। এভাবে ওদের ওপর জুলুম করা হচ্ছে কেন? এভাবে এদের মেরে ফেলা হচ্ছে কেন? আমি তো দেখতেই পাচ্ছি এই বাচ্চাদের মেরে ফেলা হয়েছে। মেরে ফেলার পর দাফনের জন্য এই গরিব বাচ্চাদের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। মৃত শিশুর জীবনের দাম কি ২০ হাজার টাকা! আমি কিচ্ছু জানি না। আমি পড়াতে গিয়ে আমার বাচ্চাদের চেহারায় মৃত্যুর গন্ধ দেখতে পাচ্ছি শুধু। আমি পড়াতেও পারছি না!
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন