সোমবার, ৩১ অক্টোবর, ২০১১

অন্যরকম সফর!

মোহাম্মদপুর প্রত্যাশা প্রাঙ্গণ। সপ্তাহব্যাপী আঞ্চলিক গানের কর্মশালায়এক ঝাঁক শিল্পীর মিলনমেলা। রাজশাহীর বিকল্প শিল্পীগোষ্ঠী, খুলনার টর্ণেডো শিল্পীগোষ্ঠী, নরসিংদীর উজ্জীবণ শিল্পীগোষ্ঠী, গাজীপুরের স্পন্দন শিল্পীগোষ্ঠী, ঢাকা মহানগরীর সাইমুম, উচ্চারণ, অনুপম, সন্দ্বীপন শিল্পীগোষ্ঠীর শিল্পীবৃন্দসহ বগুড়া, বাগেরহাট, রংপুর, বরিশাল, সিলেট, চট্টগাম খাগড়াছরিসহ সারা বাংলাদেশ থেকে বাছাই করা শিল্পীগণের পদচারণায় মুখর প্রত্যাশা প্রাঙ্গণ। বাংলাদেশের যে কোন অঞ্চলের শিল্পীগণ যেন সব অঞ্চলের আঞ্চলিক গান গাইতে পারে সেই জন্যই এই বিশাল আয়োজনের ব্যবস্থা। নিজ নিজ অঞ্চলের দু'একটা আঞ্চলিক গান নিয়ে পরিচালকের ভূমিকায় গান শিখাতে লাগলেন আঞ্চলিক শিল্পীগণ। মনমুগ্ধকর শৃংখলায় আমরা আগ্রহভরে নতুন নতুন গান শিখছি। প্রতিদিনের কর্মসূচীতে আছে নতুন গান শিক্ষা, রিহার্সাল, শারীরিক ব্যায়াম ও বিকালের সফর।


সার্বিক পরিচালনা এবং তত্ত্বাবধানে আছেন আমাদের মল্লিক ভাই। আসল নাম মতিউর রহমান। উপনাম মতি ভাই। তিনি একাধারে কন্ঠশিল্পী, কবি, গীতিকার, সুরকার ও সংগঠক। বন্ধুরা আর নিজ এলাকার পরিচিত লোকজনই শুধু মতি ভাই বলে ডাকে। বললেন মল্লিক ভাই। দিন এবং রাতের একটি নির্দিষ্ট রুটিন মোতাবেক আমরা গান গাইছি, রিহার্সাল করছি। মল্লিক ভাই বড়ই সদালাপী মানুষ। আজ দ্বিতীয় দিন। দুপুরের খাবারের পর সামান্য কাইলুলা করার পর মল্লিক ভাই আমাদের সামনে বসে নিজে এই পথে আসার কাহিনী শুনাতে লাগলেন। খুব উৎসাহ নিয়ে আমরা নিরব শ্রোতা হয়ে শুনছি। গল্পের এক ফাঁকে আমাদের উদ্দেশে বললেন, এখন আসরের আযান হবে। নামাজ পড়ে আমরা সফরে বের হব। কোথায় যাব তা বলেননি। আযান হল। মল্লিক ভাইয়ের ইমামতিতে আমরা আসরের নামাজ আদায় করলাম।


সারি বেঁধে রাস্তার এক পাশ ধরে প্রত্যাশা থেকে বেরুচ্ছি আমরা। মল্লিক ভাই আমাদের সাথে বের হলেন না। ২৬ জনের সবাই পাঞ্জাবী পড়ে আপন মনে মধ্যম গতিতে হাঁটছি। এটাও কর্মসূচীর ভেতরের কাজ। প্রতিদিন আসরের পর কোন না কোন একটি সুন্দর জায়গায় সফরে বের হতে হবে। প্রথম বারের মত সংসদ ভবন এলাকাকে আমরা নির্ধারন করেছি। উত্তর-পশ্চিম কর্ণার দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই নওশাদ ভাই গানে সুর ধরলেন- আমরাও সবাই একসাথে সেই সুরের সাথে সুর দিচ্ছি
"ধানের ক্ষেতে সবুজ জলের ঢেউ
দুলে দুলে দিগন্ত পানে
ছুঁটে চলেছে ঐ (একক)
ধানের ক্ষেতে সবুজ জলের ঢেউ
দুলে দুলে দিগন্ত পানে
ছুঁটে চলেছে ঐ (কোরাস)
সে ঢেউ কখনও রুদ্র আবার (একক)
সে ঢেউ কখনও রুদ্র আবার (কোরাস)
কখনও হয় মেঘময়
প্রাণটাকে করে মোহময় (কোরাস)
ধানের ক্ষেতে---(সবাই) "
এভাবে করে আমরা পুরো গান গাইতে গাইতে সংসদ ভবনের সীমানার ভেতর দিয়ে প্রথম গেইট দ্বিতীয় গেইট হেটে সামনে এগুচ্ছি। এখানের আকাশ বাতাস প্রতিফলিত সুরের মূ্র্ছনায় মুখরিত হচ্ছে। ধ্বনিত হচ্ছে সুরে সুরে পুরো এলাকা। ঢেউয়ের তালে তালে হাওয়ায় দুলছে এখানের মানুষগুলো। কৌতুহলী লোকজন ছুঁটে আসছে আমাদের হেটে চলা সারির কাছে। আস্তে আস্তে সূর্য পশ্চিমাকাশে হেলে যাচ্ছে। গোল হয়ে আমরা সিঁড়ির পাশে বসলাম। আমাদের পিছনে ৫-৬ সারির দর্শক।

শুরু হল নতুন দিগন্ত। কৌতুক আর দলীয় গানের সাথে হাত তালি। দর্শক-শ্রোতা আমারদের সাথে তাল মিলাচ্ছে। মূহুর্তেই আশেপাশের লোকজন জড়ো হয়ে আমাদের আনন্দের সাথে আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছে। সূ্র্য ডুবো ডুবো অবস্থায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটানো হল। অনেকেই আমাদের পরিচয় জানতে চাইল। আবার দেখা হবে আগামীকাল যে কোন পথে বলে হেটে ফিরছি প্রত্যাশার দিকে। মাগরিব নামাজ পড়ে মল্লিক ভাই আমাদের নিয়ে বসলেন। অনুষ্ঠানের আপাদমস্তক বর্ণনা করলাম। মল্লিক ভাই খুব খুশি হলেন। বললেন, তোমরা আবার যাবে। আবার নতুন করে অনুষ্ঠান সাজাবে। লোকজন যেন তোমাদের কাজে উৎসাহ পায় সেভাবে কাজ করবে। এভাবে করে আমরা পরবর্তী বিকালগুলোও আমাদের গানে অভিনয়ে ভরে রেখেছিলাম। সংসদ এলাকায় বেড়াতে আসা লোকগুলোও আমাদের অনুষ্ঠানের নিয়মিত দর্শক হয়ে প্রাণ ভরে উপভোগ করতে লাগলো আমাদের গান অভিনয় কবিতা আবৃত্তি আর কৌতুক। আমাদেরকে ভাল লাগতে শুরু করলো দর্শকদের। অজানা মানুষগুলোর সঙ্গে তারা নিরব ভালবাসায় জড়িয়ে পড়ল। ষষ্ঠ দিন আমাদের অনুষ্ঠান যথারীতি চলল। হঠাৎ বাঁজলো বিদায়ের সুর! আর আগামি কাল আমরা আসবো না। আপনারা সুস্থ্য থাকবেন। ভাল থাকবেন। এই প্রত্যাশায় বলতে বলতেই অনেকের চোখ টলমল করছে। মনের আকাশ যেন কালো মেঘে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। আমারও চোখেও পানি এসে গেল। কান্নাকে ধরে রাখতে পারলাম না।


অবশেষে দর্শকদের সাথে বুকের আলিঙ্গন। আজ মল্লিক ভাই আমাদের মাঝে নেই। এখন আমরা হলাম দর্শক-শ্রোতা। আর মল্লিক ভাই গেছেন অন্যরকম সফরে। আমাদের মুখের হঠাৎ করেই বিদায় জানানোর ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। সেই আনন্দগুলো বিনিময় করার প্রকৃত মানুষটি আর সফরের কথা বলে না। আমরাও এখন আর একসাথে কোন জায়গায় সফরে বের হই না। যে যার মত সফর করছি আমাদের প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে। দিনগুলি আজও ভেসেই চলছে হৃদয় মাঝে সংগোপনে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন